বাংলাদেশে ব্যবহৃত গাড়ি কীভাবে কিনবেন – ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

 প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:২০ পূর্বাহ্ন   |   গাড়ির টিপস এবং কৌশল , টিপস ও গাইড

বাংলাদেশে ব্যবহৃত গাড়ি কীভাবে কিনবেন – ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

বাংলাদেশে ব্যবহৃত গাড়ি কীভাবে কিনবেন – ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

আমি যখন প্রথম গাড়ি কেনার কথা ভাবছিলাম, তখন আমার মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। বাংলাদেশে একটি ভালো গাড়ি খুঁজে পাওয়া আর খড়ের গাদায় সুই খোঁজা প্রায় একই কথা। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আপনি যদি সঠিক পদ্ধতি জানেন, তবে ব্যব্যহৃত গাড়ি কীভাবে কিনবেন এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব সহজ। এই ব্লগে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে জানাব কীভাবে আপনি ঠকে না গিয়ে একটি স্বপ্নের গাড়ি নিজের করতে পারেন।

১. কেন ব্যবহৃত গাড়ি কেনা বুদ্ধিমানের কাজ?

আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন গাড়ির চেয়ে একটি ভালো মানের ব্যবহৃত গাড়ি কেনা অনেক বেশি সাশ্রয়ী। নতুন গাড়ি শোরুম থেকে বের করার সাথে সাথেই তার দাম অনেকখানি কমে যায়। তাই যারা সীমিত বাজেটে একটু লাক্সারি বা ভালো মানের ব্র্যান্ডের গাড়ি চালাতে চান, তাদের জন্য সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনা-বেচা একটি চমৎকার সমাধান হতে পারে। আমি নিজে যখন প্রথম গাড়ি কিনি, তখন সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি বেছে নিয়েছিলাম কারণ এতে রেজিস্ট্রেশন এবং ট্যাক্সের বড় একটি অংশ আগের মালিক পরিশোধ করে থাকেন।

দ্বিতীয়ত, ব্যবহৃত গাড়ির মেইনটেইনেন্স সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পাওয়া যায়। আগের মালিক গাড়িটি কীভাবে চালিয়েছেন এবং ঢাকার রাস্তায় সেটি কেমন পারফর্ম করে, তা আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, গাড়ি কেনার আগে আপনাকে অবশ্যই মেকানিক দিয়ে চেক করিয়ে নিতে হবে। আমি সবসময় বলি, সস্তায় পাওয়ার আশায় কোনো বড় ত্রুটিযুক্ত গাড়ি কেনা ঠিক হবে না। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে আপনি কম টাকায় প্রিমিয়াম ফিল পাবেন।

তথ্য বক্স ১: বাংলাদেশে ব্যবহৃত গাড়ির বাজার প্রতি বছর ১৫% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে মানুষ রিকন্ডিশন্ড গাড়ির চেয়ে লোকাল ইউজড গাড়ির দিকে বেশি ঝুঁকছে।

২. বাজেট নির্ধারণ ও বাংলাদেশে ব্যবহৃত গাড়ির দাম

গাড়ি কেনার প্রথম ধাপ হলো নিজের পকেটের অবস্থা বোঝা। বাংলাদেশে ব্যবহৃত গাড়ির দাম মূলত গাড়ির কন্ডিশন, মডেলের বছর এবং ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর করে। আমি যখন বাজার যাচাই করলাম, দেখলাম ৮ থেকে ১২ লক্ষ টাকার মধ্যে বেশ ভালো মানের সেডান গাড়ি পাওয়া যায়। তবে আপনার যদি বাজেট একটু বেশি হয়, তবে ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকার মধ্যে প্রিমিয়ার বা এসইউভি মডেলগুলোও দেখতে পারেন। বাজেট করার সময় অবশ্যই গাড়ির দামের বাইরে আরও অন্তত ৫০ হাজার টাকা হাতে রাখা উচিত।

এই অতিরিক্ত টাকা আপনার নাম পরিবর্তন বা মালিকানা বদলির ফি এবং ছোটখাটো মেরামতের জন্য লাগবে। আমি অনেককে দেখেছি যারা শেষ সম্বল দিয়ে গাড়ি কেনেন কিন্তু পরে ফিটনেস বা ট্যাক্স টোকেন আপডেটের টাকা পান না। এমন অবস্থায় পড়লে গাড়ি চালানো আপনার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই সবসময় বাজেটের ১০% টাকা অতিরিক্ত মেরামতের জন্য আলাদা করে রাখুন। বাংলাদেশে জাপানি গাড়ির রিসেল ভ্যালু অনেক বেশি, তাই বাজেট করার সময় ভবিষ্যতে বিক্রির কথাও মাথায় রাখা ভালো।

বাজেট নির্ধারণের কিছু ছোট টিপস

বাজেট ঠিক করার সময় আপনার মাসিক আয়ের কথা ভাবুন। গাড়ি কেবল কিনলেই হয় না, প্রতি মাসে এর জ্বালানি এবং মেইনটেইনেন্স খরচ আছে। আমার পরামর্শ হলো, আপনার বার্ষিক আয়ের বেশি দামি গাড়ি কেনা এড়িয়ে চলুন। এতে আপনার আর্থিক চাপ কম থাকবে এবং গাড়ি চালানো হবে আনন্দদায়ক।

৩. সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনা-বেচা করার মাধ্যম

এখনকার দিনে গাড়ি খোঁজা অনেক সহজ হয়ে গেছে। আমি সাধারণত অনলাইন পোর্টাল যেমন Bikroy বা ফেসবুক গ্রুপগুলো ব্যবহার করি। তবে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনা-বেচা করার সময় অনলাইনে ছবি দেখে কখনোই টাকা লেনদেন করবেন না। বাংলাদেশে অনেক রিকন্ডিশন্ড শোরুমও এখন ব্যবহৃত গাড়ি বিক্রি করছে, যা তুলনামূলক নিরাপদ। আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত কারো কাছ থেকে বা বিশ্বস্ত কোনো শোরুম থেকে গাড়ি কেনা পছন্দ করি কারণ সেখানে ঠকার ভয় কম থাকে।

অনলাইনে গাড়ি দেখার সময় বিক্রেতার প্রোফাইল এবং কমেন্ট চেক করুন। অনেক সময় দালালের খপ্পরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আমি যখন গাড়ি খুঁজছিলাম, তখন অন্তত ৫টি গাড়ি সরাসরি গিয়ে দেখেছিলাম। এতে বাজারের বর্তমান অবস্থা এবং গাড়ির কোয়ালিটি সম্পর্কে আপনার পরিষ্কার ধারণা তৈরি হবে। অনলাইনে গাড়ি পছন্দ হলে বিক্রেতাকে সরাসরি ফোন দিন এবং দিনের আলোতে গাড়িটি দেখার জন্য সময় নির্ধারণ করুন। অন্ধকারে গাড়ি দেখলে বডির দাগ বা ছোটখাটো স্ক্র্যাচ চোখে পড়ে না।

সতর্কতা: ফেসবুকে অনেক সময় অবিশ্বাস্য কম দামে গাড়ির বিজ্ঞাপন দেখা যায়। এগুলো বেশিরভাগই জালিয়াতি হতে পারে। সরাসরি দেখা না করে এক টাকাও অগ্রিম দেবেন না।

৪. বাংলাদেশে গাড়ির ফিটনেস চেক করার সহজ উপায়

বাংলাদেশে গাড়ির ফিটনেস চেক করা একটি অতি প্রয়োজনীয় ধাপ। আমি সবসময় পরামর্শ দিই যে, গাড়ির বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে এর যান্ত্রিক ফিটনেস এবং কাগজপত্রের বৈধতা যাচাই করা বেশি জরুরি। বিআরটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট নির্দিষ্ট সময় পর পর নবায়ন করতে হয়। আপনি যখন কোনো গাড়ি পছন্দ করবেন, তখন মালিকের কাছ থেকে ফিটনেস সার্টিফিকেটের কপি চেয়ে নিন এবং এর মেয়াদ দেখুন। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সেটি নবায়ন করার দায়িত্ব কার, তা আগেই পরিষ্কার করে নিন।

শারীরিক ফিটনেস পরীক্ষার জন্য আমি একজন দক্ষ মেকানিক সাথে রাখার কথা বলি। তিনি গাড়ির ব্রেক, সাসপেনশন এবং টায়ার চেক করে বলতে পারবেন গাড়িটি রাস্তায় চলার উপযোগী কিনা। আমি একবার একটি গাড়ি পছন্দ করেছিলাম যা দেখতে খুব সুন্দর ছিল, কিন্তু মেকানিক চেক করে জানালেন সেটির সাসপেনশন একদম শেষ। তাই চোখের দেখা আর বিশেষজ্ঞের দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। ঢাকার রাস্তায় জ্যাম এবং গর্তের কারণে গাড়ির ফিটনেস দ্রুত নষ্ট হয়, তাই খুব সাবধানে এটি পরীক্ষা করুন।

৫. হাইব্রিড না কি নন-হাইব্রিড গাড়ি: কোনটি সেরা?

বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন— হাইব্রিড না কি নন-হাইব্রিড গাড়ি কেনা ভালো? আমার মতে, আপনি যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ঢাকার জ্যামে বসে থাকেন, তবে হাইব্রিড গাড়ি আপনার জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। হাইব্রিড গাড়ির প্রধান সুবিধা হলো এর ফুয়েল এফিসিয়েন্সি বা জ্বালানি সাশ্রয়। তবে ব্যবহৃত হাইব্রিড গাড়ি কেনার সময় এর ব্যাটারি লাইফ বা হেলথ চেক করা অত্যন্ত জরুরি। একটি নতুন হাইব্রিড ব্যাটারির দাম বাংলাদেশে বেশ চড়া, যা আপনার বাজেটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, নন-হাইব্রিড বা সাধারণ পেট্রোল ইঞ্জিন গাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তুলনামূলক কম। এই গাড়িগুলোর মেকানিক বাংলাদেশের যেকোনো জায়গায় সহজে পাওয়া যায়। আমি যদি খুব বেশি গাড়ি না চালাই বা বছরে দু-একবার লম্বা ট্যুরে যাই, তবে আমি নন-হাইব্রিড গাড়িকেই প্রাধান্য দিই। কারণ এতে ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না এবং রিসেল ভ্যালুও বেশ স্থিতিশীল থাকে। নিচে আমি একটি তুলনামূলক ছক দিচ্ছি যা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে:

বৈশিষ্ট্য হাইব্রিড গাড়ি নন-হাইব্রিড গাড়ি
জ্বালানি খরচ খুবই কম (সাশ্রয়ী) তুলনামূলক বেশি
রক্ষণাবেক্ষণ জটিল ও ব্যয়বহুল সহজ ও সাশ্রয়ী
ব্যাটারি লাইফ নির্দিষ্ট সময় পর বদলাতে হয় সাধারণ ছোট ব্যাটারি
পরিবেশবান্ধব হ্যাঁ, কার্বন নিঃসরণ কম না, নির্গমন বেশি

৬. টয়োটা করোল্লা ব্যবহৃত গাড়ির দাম ও কেনাকাটা

বাংলাদেশের রাস্তার রাজা বলা হয় টয়োটা করোল্লাকে। আপনি যদি সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে একটু খোঁজ নেন, তবে দেখবেন টয়োটা করোল্লা ব্যবহৃত গাড়ির দাম অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় একটু বেশি থাকে। এর প্রধান কারণ হলো এই গাড়ির পার্টস সর্বত্র পাওয়া যায় এবং এর ইঞ্জিন অত্যন্ত টেকসই। আমি নিজে অনেক বছর করোল্লা চালিয়েছি এবং এর পারফরম্যান্সে আমি মুগ্ধ। ২০০৫ থেকে ২০১২ মডেলের করোল্লাগুলো এখনো ঢাকার রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে একটি ভালো মানের টয়োটা করোল্লা (মডেল ২০০৭-২০১০) কিনতে চাইলে আপনাকে ১০ থেকে ১৪ লক্ষ টাকা গুনতে হতে পারে। আমি পরামর্শ দেব, কেনার সময় 'G-Corolla' বা 'Luxel' গ্রেডগুলো দেখার জন্য, কারণ এগুলোর ইন্টেরিয়র এবং ফিচার অনেক ভালো হয়। তবে করোল্লা কেনার সময় অনেক সময় 'এক্সিডেন্ট হিস্ট্রি' লুকানো থাকে। যেহেতু এই গাড়িগুলো অনেক বেশি ব্যবহৃত হয়, তাই বডি প্যানেলগুলো ভালোভাবে চেক করুন যে কোথাও নতুন করে পেইন্ট করা হয়েছে কিনা।

৭. গাড়ি কেনার সতর্কতা: যে ভুলগুলো করবেন না

আমি সবসময় বলি, গাড়ি কেনা যতটা আনন্দের, ভুল গাড়ি কেনা ততটাই কষ্টের। গাড়ি কেনার সতর্কতা হিসেবে আমার প্রথম টিপস হলো— তাড়াহুড়ো করবেন না। অনেক বিক্রেতা আপনাকে বলতে পারে "আরও অনেক কাস্টমার আছে, এখনই বুকিং দিন"। এই ফাঁদে পা দেবেন না। গাড়ির চ্যাসিস এবং ইঞ্জিন নম্বর ব্লু-বুকের সাথে মিল আছে কিনা তা নিজে দেখে নিন। অনেক সময় ইঞ্জিন পরিবর্তন করা হয় কিন্তু কাগজে আপডেট করা থাকে না, যা পরে বড় আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, গাড়িটি বড় কোনো দুর্ঘটনায় পড়েছিল কিনা তা বোঝার চেষ্টা করুন। যদি গাড়ির গ্লাস বা লাইটগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়, তবে বুঝবেন সেগুলো পরিবর্তন করা হয়েছে। আমি একবার এমন এক গাড়ি দেখেছিলাম যার সামনের দিকটা একদম নতুন ছিল কিন্তু পেছনের রঙ ফ্যাকাশে। এটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয় যে গাড়িটি সামনে থেকে বড় ধাক্কা খেয়েছিল। এছাড়াও, টেস্ট ড্রাইভ ছাড়া কখনোই গাড়ি চূড়ান্ত করবেন না। গাড়ি চালানোর সময় কোনো অদ্ভুত শব্দ বা কাঁপুনি হচ্ছে কিনা তা খেয়াল করুন।

তথ্য বক্স ২: বাংলাদেশে বর্তমানে ডিজিটাল নাম্বার প্লেট এবং স্মার্ট কার্ড রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক। গাড়ি কেনার সময় এই দুটি জিনিস আছে কিনা নিশ্চিত করুন।

৮. বিআরটিএ মালিকানা পরিবর্তন পদ্ধতি ও টিপস

গাড়ি কেনা শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় কাজ হলো মালিকানা নিজের নামে করা। বিআরটিএ মালিকানা পরিবর্তন পদ্ধতি একটু সময়সাপেক্ষ মনে হতে পারে, কিন্তু এটি ছাড়া আপনি গাড়ির আইনগত মালিক হতে পারবেন না। প্রথমে আপনাকে বিক্রেতার কাছ থেকে টিও (T.O) এবং টিটিও (T.T.O) ফরমে স্বাক্ষর নিতে হবে। এরপর একটি বিক্রয় হলফনামা বা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে নোটারি করে নিতে হবে। আমি পরামর্শ দেব, কোনো দালালের সাহায্য না নিয়ে নিজেই বিআরটিএ অফিসে যান, এতে খরচ অনেক কম হবে।

মালিকানা পরিবর্তনের জন্য ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কেই বিআরটিএ অফিসে বায়োমেট্রিক প্রদানের জন্য উপস্থিত হতে হয়। আমি যখন আমার গাড়ির মালিকানা পরিবর্তন করি, তখন ব্যাংকে প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়ে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছিলাম। এতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ঝামেলা এড়ানো যায়। মনে রাখবেন, মালিকানা পরিবর্তনের জন্য গাড়ির আপডেট ট্যাক্স টোকেন এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক। কাগজপত্র সব ঠিক থাকলে সাধারণত ১-২ মাসের মধ্যে আপনি নতুন স্মার্ট কার্ড পেয়ে যাবেন।

মালিকানা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

আপনার সুবিধার্থে আমি একটি লিস্ট দিচ্ছি: ১. ক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ২. টিও ও টিটিও ফরম, ৩. অরিজিনাল ব্লু-বুক বা স্মার্ট কার্ড, ৪. ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস কপি, ৫. ৩০০ টাকার নোটারি করা হলফনামা, এবং ৬. ক্রেতার পাসপোর্ট সাইজ ছবি। এই কাগজগুলো ফাইল করে রাখলে আপনার কাজ অনেক দ্রুত হয়ে যাবে।

৯. ইঞ্জিনের কন্ডিশন ও পারফরম্যান্স যাচাই

একটি গাড়ির প্রাণ হলো তার ইঞ্জিন। আমি যখন কোনো ব্যবহৃত গাড়ি দেখি, তখন প্রথমেই ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে এর শব্দ শুনি। যদি ইঞ্জিন থেকে খসখসে বা ধাতব কোনো শব্দ আসে, তবে বুঝতে হবে ভেতরে বড় কোনো সমস্যা আছে। এছাড়াও এক্সজস্ট পাইপ বা সাইলেন্সার দিয়ে নীল বা কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে কিনা তা লক্ষ্য করুন। নীল ধোঁয়া মানে ইঞ্জিন অয়েল পুড়ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি সমস্যা। ভালো ইঞ্জিনের শব্দ হবে একদম মসৃণ এবং স্থির।

ইঞ্জিন অয়েলের ক্যাপ খুলে ভেতরে কাদার মতো কিছু জমে আছে কিনা দেখুন। একে বলা হয় 'ইঞ্জিন স্লাজ'। যদি ইঞ্জিন নিয়মিত পরিষ্কার করা না হয়, তবে এই সমস্যা দেখা দেয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন গাড়ি এড়িয়ে চলি যা অনেক বেশি কিলোমিটার (মাইলেজ) চলেছে অথচ কোনো সার্ভিস রেকর্ড নেই। বাংলাদেশে মাইলেজ টেম্পারিং বা মিটার কমিয়ে রাখা খুব সাধারণ একটি বিষয়। তাই শুধু মিটারের রিডিং না দেখে প্যাডেল এবং স্ট্রিয়ারিং হুইলের ক্ষয় দেখে বোঝার চেষ্টা করুন গাড়িটি আসলে কতটুকু চলেছে।

১০. দামাদামি এবং চুক্তি করার সঠিক নিয়ম

বাংলাদেশে গাড়ি কেনা মানেই হলো দরদাম বা বার্গেনিং করা। বিক্রেতা যে দাম চাইবে, সেটিই চূড়ান্ত নয়। আমি সবসময় বর্তমান বাজার দর যাচাই করে একটি যৌক্তিক দাম অফার করি। যদি গাড়িতে ছোটখাটো মেরামত প্রয়োজন হয়, তবে সেই খরচটি গাড়ির দাম থেকে কমিয়ে দিতে বলুন। আমি দেখেছি, সুন্দরভাবে কথা বললে বিক্রেতারা প্রায়ই ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমিয়ে দেয়। তবে দামাদামি করার সময় মার্জিত থাকা জরুরি যাতে বিক্রেতা আপনার প্রতি বিরক্ত না হন।

দাম চূড়ান্ত হওয়ার পর অবশ্যই একটি লিখিত চুক্তি করুন। চুক্তিতে গাড়ির বর্তমান অবস্থা, চেসিস ও ইঞ্জিন নম্বর এবং কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে তা উল্লেখ করুন। আমি সবসময় পরামর্শ দিই বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে বা পে-অর্ডারে লেনদেন করতে। এতে লেনদেনের একটি প্রমাণ থাকে যা ভবিষ্যতে যেকোনো আইনি ঝামেলায় আপনাকে রক্ষা করবে। নগদ টাকা হাতে হাতে দিলে অবশ্যই তার একটি মানি রিসিট বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বুঝে নিন।

প্রো-টিপ: গাড়ি বিক্রির চুক্তিতে উল্লেখ করুন যে, মালিকানা পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রাফিক মামলা বা দুর্ঘটনার দায়ভার বিক্রেতার ওপর থাকবে (যদি সেটি আগে ঘটে থাকে)।

১১. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

প্রশ্ন ১: ব্যবহৃত গাড়ি কেনার জন্য সেরা সময় কোনটি?
উত্তর: বাংলাদেশে সাধারণত ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসে ব্যবহৃত গাড়ির সরবরাহ বেশি থাকে কারণ অনেক মানুষ নতুন বছরের মডেলের গাড়ি কেনার জন্য পুরোনো গাড়ি বিক্রি করে দেন। এই সময়ে আপনি ভালো দরদাম করার সুযোগ পাবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, রমজান মাসের ঠিক আগে বা পরে গাড়ি কেনা এড়িয়ে চলা ভালো কারণ তখন দাম কিছুটা বাড়তি থাকে।
প্রশ্ন ২: দালালের মাধ্যমে গাড়ি কেনা কি নিরাপদ?
উত্তর: সত্যি বলতে, দালালের মাধ্যমে গাড়ি কেনা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে কারণ তারা অনেক সময় গাড়ির ত্রুটি লুকিয়ে রাখে। তবে আপনি যদি একদমই সময় না পান, তবে বিশ্বস্ত কোনো ব্রোকার বা কার ডিলার হাউজ বেছে নিতে পারেন। দালালের মাধ্যমে কিনলে অবশ্যই নিরপেক্ষ কোনো মেকানিক দিয়ে গাড়িটি পরীক্ষা করিয়ে নেবেন এবং সব কাগজপত্র বিআরটিএ থেকে নিজে যাচাই করবেন।
প্রশ্ন ৩: ব্যাংক লোনে কি ব্যবহৃত গাড়ি কেনা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক ব্যাংক এবং লিজিং কোম্পানি ব্যবহৃত বা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির জন্য লোন সুবিধা দিচ্ছে। তবে শর্ত থাকে যে গাড়িটি একটি নির্দিষ্ট বছরের চেয়ে পুরোনো হওয়া যাবে না (সাধারণত ৫-৭ বছরের পুরোনো গাড়ি)। লোনের ক্ষেত্রে ইন্টারেস্ট রেট নতুন গাড়ির চেয়ে কিছুটা বেশি হতে পারে, তাই আবেদনের আগে কিস্তির পরিমাণ ভালোভাবে ক্যালকুলেট করে নিন।
প্রশ্ন ৪: সিএনজি বা এলপিজি করা গাড়ি কেনা কি ভালো?
উত্তর: আপনি যদি জ্বালানি খরচ কমাতে চান তবে সিএনজি বা এলপিজি করা গাড়ি একটি ভালো বিকল্প। তবে মনে রাখবেন, অতিরিক্ত সিলিন্ডারের ভারে গাড়ির সাসপেনশন দ্রুত দুর্বল হতে পারে এবং ডিকি বা বুট স্পেস কমে যায়। আমি পরামর্শ দেব এমন গাড়ি কিনতে যা সম্প্রতি এলপিজি কনভার্ট করা হয়েছে, কারণ পুরোনো সিএনজি কিট ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করতে পারে।
প্রশ্ন ৫: মালিকানা পরিবর্তনে কত টাকা খরচ হয়?
উত্তর: বিআরটিএ-তে মালিকানা পরিবর্তনের খরচ গাড়ির সিসি (Engine Capacity) অনুযায়ী ভিন্ন হয়। ১৫০০ সিসি গাড়ির জন্য সরকারি ফি প্রায় ২০,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকার আশেপাশে হয়ে থাকে। এর সাথে স্ট্যাম্প ডিউটি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে আরও কিছু টাকা লাগতে পারে। তবে সঠিক তথ্যের জন্য সবসময় বিআরটিএ-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট চেক করা বা সরাসরি অফিসে যোগাযোগ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশে একটি ভালো ব্যবহৃত গাড়ি কেনা ধৈর্য এবং সচেতনতার বিষয়। আপনি যদি এই নির্দেশিকাটি অনুসরণ করেন, তবে ব্যবহৃত গাড়ি কীভাবে কিনবেন তা নিয়ে আপনার আর কোনো সংশয় থাকবে না।