বাংলাদেশে প্রথম গাড়ি কেনার আগে ১০টি মারাত্মক ভুল যা সবাই করে
বাংলাদেশে প্রথম গাড়ি কেনার আগে ১০টি মারাত্মক ভুল যা সবাই করে
বাংলাদেশে নিজের একটা গাড়ি কেনা মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অনেক বড় স্বপ্ন। গাড়ি মানে শুধু চলাফেরা না, পরিবারকে আরাম দেওয়া, নিরাপদে চলা এবং স্বপ্ন পূরণ করা,কিন্তু সমস্যা হলো, গাড়ি কেনার সময় আমরা অনেক সময় বেশি উত্তেজিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। তখন না বুঝেই এমন গাড়ি কিনে ফেলি, যেটা পরে আমাদের পকেট আর মাথা দুটোকেই চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। আপনি যদি ২০২৬ সালে গাড়ি কেনার কথা ভাবেন, তাহলে শুধু দেখতে সুন্দর বা কম দামের গাড়ি দেখলেই চলবে না। বাজারে অনেক ফাঁদ আছে যেমন দালাল, লুকানো খরচ, আর ভুল তথ্য এগুলো না জানলে পরে বড় ক্ষতি হতে পারে। এই লেখায় আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে খুব সহজ ভাষায় দেখাব, কীভাবে আপনি কোনো ঝামেলা ছাড়া, ভুল না করে আপনার প্রথম গাড়িটা কিনতে পারেন।
- ১. বাজেটিংয়ের সময় হিডেন কস্ট ভুলে যাওয়া
- ২. রিকন্ডিশন্ড বনাম ব্যবহৃত গাড়ির ভুল নির্বাচন
- ৩. বিআরটিএ পেপারস ভেরিফিকেশনে অবহেলা
- ৪. গাড়ির যান্ত্রিক পরীক্ষা বা ইন্সপেকশন না করা
- ৫. রিসেল ভ্যালু সম্পর্কে ধারণা না থাকা
- ৬. জ্বালানি খরচ ও কনভারশন নিয়ে ভুল হিসাব
- ৭. রেজিস্ট্রেশন ও ইন্স্যুরেন্সের সঠিক তথ্য না জানা
- ৮. রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেইনেন্স খরচের গুরুত্ব না দেওয়া
- ৯. ২০২৬ সালে বাংলাদেশে গাড়ি কেনার নতুন নিয়ম
- ১০. লুক দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং টেস্ট ড্রাইভ না দেওয়া
১. বাজেট করার সময় হিডেন খরচ ভুলে যাওয়া
আমি যখন প্রথম গাড়ি কিনেছিলাম, তখন আমার মনে হয়েছিল—হাতে যদি ১৫ লক্ষ টাকা থাকে, তাহলেই বুঝি সব খরচ মিটে যাবে। কিন্তু গাড়ি কেনার পরে বুঝলাম, বাস্তবতা আসলে একদম আলাদা। বাংলাদেশে গাড়ি কিনলে শুধু গাড়ির দাম দিলেই কাজ শেষ হয় না। এর বাইরে আরও অনেক ছোট–বড় খরচ থাকে, যেগুলো বেশিরভাগ নতুন ক্রেতাই আগে থেকে ভাবেন না। যেমন—ব্যাংক লোন নিলে তার প্রসেসিং ফি, গাড়ির নাম ট্রান্সফার করার খরচ, আর গাড়ি কেনার পর প্রথম দিকের কিছু কাজ—ইঞ্জিন অয়েল বদলানো, টায়ার বা ব্যাটারি পাল্টানো ইত্যাদি। এই সব মিলিয়ে অনেক সময় অতিরিক্ত ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। এর সঙ্গে আবার বিআরটিএ-র ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস রেজিস্ট্রেশন এর টাকাও দিতে হয়। আপনি যদি পুরো বাজেট শুধু গাড়ি কিনতেই খরচ করে ফেলেন, তাহলে গাড়ি হাতে পাওয়ার পরই টাকার টান পড়বে। তাই আমার সহজ পরামর্শ হলো—গাড়ি কেনার সময় আপনার মোট বাজেটের অন্তত ১০–১৫% টাকা আলাদা করে রাখুন এই বাড়তি খরচগুলোর জন্য। তাহলে গাড়ি কেনার আনন্দটা চাপ হয়ে যাবে না, বরং নিশ্চিন্তে আর মজা করে ড্রাইভ করতে পারবেন।
২. রিকন্ডিশন্ড বনাম ব্যবহৃত গাড়ির তুলনা
বাংলাদেশে গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দ্বিধা হলো রিকন্ডিশন্ড বনাম ব্যবহৃত গাড়ি। আমি দেখেছি অনেকেই বুঝতে পারেন না তাদের জন্য কোনটি সেরা। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনার সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় এর স্বচ্ছতার কথা। এই গাড়িগুলো সরাসরি জাপান থেকে আসে এবং এতে একটি 'অকশন শিট' থাকে যা দেখে আপনি গাড়ির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারেন। রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে সাধারণত ঝামেলা কম থাকে এবং নতুন গাড়ির ফিল পাওয়া যায়, তবে এর দাম অনেক বেশি হয়।
অন্যদিকে, ব্যবহৃত বা পুরাতন গাড়ি কেনা সাশ্রয়ী হলেও এতে অনেক ঝুঁকি থাকে। যদি আপনি পুরাতন গাড়ি কেনার সময় সতর্কতা (Buying used car precautions) অবলম্বন না করেন, তবে আপনি বড় লোকসানে পড়তে পারেন। ব্যবহৃত গাড়িতে প্রায়ই লুকানো যান্ত্রিক ত্রুটি থাকে যা কেনার সময় বোঝা যায় না। আমি মনে করি, আপনার যদি বাজেট ভালো থাকে তবে রিকন্ডিশন্ড নেওয়া ভালো, কিন্তু বাজেট কম হলে ব্যবহৃত গাড়ি কিনুন তবে অবশ্যই একজন দক্ষ মেকানিক দিয়ে চেক করিয়ে নিন। সঠিক সিদ্ধান্ত আপনার কয়েক বছরের শান্তি নিশ্চিত করবে।
রিকন্ডিশন্ড ও ইউজড কারের পার্থক্য
রিকন্ডিশন্ড গাড়ি হলো জাপানে অল্প চলা এবং পুনরায় নতুনের মতো করা গাড়ি। আর ইউজড কার হলো যা বাংলাদেশে আগে কেউ চালিয়েছেন। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির রিসেল ভ্যালু বেশি হলেও ইউজড কার আপনাকে কম বাজেটে বড় গাড়ি কেনার সুযোগ দেয়।
| বিবরণ | রিকন্ডিশন্ড গাড়ি | পুরাতন (ইউজড) গাড়ি |
|---|---|---|
| ক্রয়মূল্য | ২০ - ৩০ লক্ষ+ | ৮ - ১৫ লক্ষ |
| মেইনটেইনেন্স | খুব কম | মাঝারি থেকে বেশি |
| রিসেল ভ্যালু | চমৎকার | মাঝারি |
| ইন্সপেকশন সুবিধা | অকশন শিট আছে | নিজস্ব ফিজিক্যাল চেক |
৩. বিআরটিএ পেপারস ভেরিফিকেশনে অবহেলা
গাড়ি কেনার সময় উত্তেজনার বশে আমরা অনেকেই পেপারস চেক করতে ভুলে যাই। আমি অনেক মানুষকে দেখেছি যারা গাড়ি কিনে পরে জানতে পেরেছেন যে গাড়ির বড় ধরণের ব্যাংক লোন আছে বা ট্যাক্স টোকেন অনেক বছর ফেইল। গাড়ির পেপারস চেক করার সঠিক উপায় হলো সরাসরি বিআরটিএ অফিসে গিয়ে চ্যাসিস এবং ইঞ্জিন নম্বর দিয়ে তথ্য যাচাই করা। বিআরটিএ পেপারস ভেরিফিকেশন (BRTA papers check) ছাড়া গাড়ি কেনা মানে হলো নিজের পায়ে কুড়াল মারা। পেপারসে কোনো ঘষা-মাজা বা অমিল থাকলে সেই গাড়ি থেকে দূরে থাকুন।
বর্তমানে অনেক দালাল চক্র ভুয়া পেপারস তৈরি করে গাড়ি বিক্রি করে। তাই আমি সবসময় বলি, স্মার্ট কার্ড এবং ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের বারকোড স্ক্যান করে দেখুন। এছাড়া গাড়ির আগের মালিকের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হোন যে কোনো ট্রাফিক ফাইন বা আইনি ঝামেলা বকেয়া নেই। ২০২৬ সালে বিআরটিএ প্রক্রিয়া অনেক ডিজিটাল হয়েছে, তাই অনলাইনেও অনেক কিছু যাচাই করা সম্ভব। এই ছোট একটি অবহেলা আপনাকে আদালতের বারান্দা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, তাই সাবধান থাকা জরুরি।
৪. গাড়ির যান্ত্রিক পরীক্ষা বা ইন্সপেকশন না করা
বাইরে থেকে পালিশ করা চকচকে গাড়ি দেখে কখনোই ধরে নেবেন না যে এর ইঞ্জিন বা গিয়ারবক্স ভালো আছে। আমি দেখেছি বাংলাদেশে অনেক পুরাতন গাড়িকে নতুন রঙ করে বিক্রি করা হয়। পুরাতন গাড়ি কেনার সময় সতর্কতা (Buying used car precautions) হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ যান্ত্রিক পরীক্ষা বা অটো-স্ক্যানিং করানো বাধ্যতামূলক। গাড়ির ইঞ্জিন থেকে কোনো অস্বাভাবিক শব্দ আসছে কিনা, গিয়ার পরিবর্তন করতে সময় নিচ্ছে কিনা বা এসি কম্প্রেসর ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে।
এছাড়া গাড়ির বডিতে কোনো এক্সিডেন্ট হিস্ট্রি আছে কিনা তা দেখতে হবে। যদি গাড়ির পিলার বা সামনের চেসিসে ঝালাই করা থাকে, তবে সেই গাড়িটি আপনার জন্য অনিরাপদ হতে পারে। আমি সবসময় পরামর্শ দিই একজন বিশ্বস্ত মেকানিককে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য, অথবা কোনো প্রফেশনাল অটো-চেকআপ সেন্টার থেকে রিপোর্ট নেওয়ার জন্য। কয়েক হাজার টাকা খরচ করে এই পরীক্ষাটি করালে আপনি ভবিষ্যতে কয়েক লক্ষ টাকার বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পারেন। আপনার নিরাপত্তা এবং অর্থ—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
যান্ত্রিক পরীক্ষার চেকলিস্ট
ইঞ্জিন কন্ডিশন, গিয়ারবক্স রেসপন্স, সাসপেনশন নয়েজ, এবং ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং চেক করুন। এছাড়া গাড়ির নিচের দিকে কোথাও মরিচা (Rust) ধরেছে কিনা তাও দেখে নেওয়া জরুরি।
৫. রিসেল ভ্যালু সম্পর্কে ধারণা না থাকা
বাংলাদেশে গাড়ি কেনা শুধুমাত্র ব্যবহারের জন্য নয়, এটি একটি সম্পদ বা অ্যাসেট। আমি লক্ষ্য করেছি অনেক নতুন ক্রেতা এমন সব আনকমন ব্র্যান্ড বা মডেলের গাড়ি কেনেন যার পার্টস পাওয়া কঠিন এবং রিসেল ভ্যালু একদমই নেই। গাড়ির রিসেল ভ্যালু যাচাই (Car resale value BD) করা অত্যন্ত জরুরি। টয়োটা বা নিসানের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনলে আপনি ৩-৪ বছর ব্যবহার করার পর ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু এমন কোনো ব্র্যান্ড যা বাংলাদেশে জনপ্রিয় নয়, তা বিক্রি করতে গিয়ে আপনি ক্রেতাই পাবেন না।
আমি সবসময় বলি, প্রথম গাড়ির ক্ষেত্রে 'মার্কেট ট্রেন্ড' অনুসরণ করা নিরাপদ। টয়োটা করোলা, এক্সিও বা প্রিমিওর মতো গাড়িগুলোর চাহিদা বাংলাদেশে সবসময় থাকে। আপনি যখন বাংলাদেশে গাড়ি কেনার নিয়ম ২০২৬ মেনে একটি গাড়ি কিনছেন, তখন ভাবুন যে ৫ বছর পর যখন আপনি এটি বিক্রি করবেন, তখন এর বাজার দর কেমন থাকবে। রিসেল ভ্যালু ভালো হলে আপনার নতুন গাড়ি কেনার পথ অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই শখের বশে এমন কিছু কিনবেন না যা পরে আপনার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে।
৬. জ্বালানি খরচ ও কনভারশন নিয়ে ভুল হিসাব
ঢাকার ট্রাফিক জ্যামে গাড়ি চালানো মানে হলো প্রচুর জ্বালানি পোড়ানো। আমি দেখেছি অনেক ক্রেতা গাড়ি কেনার সময় এর ফুয়েল এফিসিয়েন্সি নিয়ে মোটেও ভাবেন না। পরে যখন দেখেন প্রতি মাসে তেলের পেছনে বিশাল অংক খরচ হচ্ছে, তখন তারা বিপাকে পড়েন। অকটেন বনাম এলপিজি খরচ তুলনা করা এখন সময়ের দাবি। অকটেনে ড্রাইভ করা স্মুথ হলেও এর খরচ অনেক বেশি। অন্যদিকে এলপিজি কনভারশন করলে খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়, তবে এতে ইঞ্জিনের কিছুটা পাওয়ার লস হতে পারে এবং ডিকিতে সিলিন্ডারের কারণে জায়গা কমে যায়।
২০২৬ সালে হাইব্রিড গাড়ির জনপ্রিয়তা বাংলাদেশে তুঙ্গে। আপনি যদি জ্বালানি খরচ কমাতে চান তবে রিকন্ডিশন্ড হাইব্রিড গাড়ি বেছে নিতে পারেন। তবে যদি আপনি ব্যবহৃত গাড়ি কেনেন এবং তা অকটেনে চলে, তবে মাসে আপনার কত টাকা খরচ হবে তার একটা হিসাব আগে থেকেই করে রাখুন। তেলের বাজার দরের অস্থিরতার কথা মাথায় রেখে একটি জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ি নির্বাচন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। গাড়ি কেনার হিডেন কস্ট (Hidden costs of buying a car) এর তালিকায় জ্বালানি খরচই সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদী ব্যয়।
মাইলেজ ও সাশ্রয়
১৫০০ সিসি-র একটি অকটেন চালিত গাড়ি ঢাকা শহরে লিটারে ৬-৮ কিমি যেতে পারে, যেখানে হাইব্রিড গাড়ি অনায়াসে ১৫-১৮ কিমি যেতে সক্ষম। কনভারশন করলে এলপিজি-ই এখন সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম।
৭. রেজিস্ট্রেশন ও ইন্স্যুরেন্সের সঠিক তথ্য না জানা
গাড়ির দাম পরিশোধ করার পরেই বড় ধাক্কাটা আসে রেজিস্ট্রেশনের সময়। আমি অনেক ক্রেতাকে দেখেছি যারা জানেনই না যে বর্তমানে রেজিস্ট্রেশন ফি কত। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ইন্স্যুরেন্স খরচ বাংলাদেশ এ গাড়ির সিসি (CC) অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ১৫০০ সিসির নিচে এক ধরণের খরচ, আবার ১৫০০ থেকে ২০০০ সিসির জন্য খরচ প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া বাৎসরিক অগ্রিম আয়কর (AIT) যা ২০-২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়, তাও আপনাকে মাথায় রাখতে হবে।
ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে থার্ড পার্টি ইন্স্যুরেন্স বাধ্যতামূলক হলেও আমি ফার্স্ট পার্টি বা কম্প্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্সের পরামর্শ দেব। ঢাকার রাস্তায় যেকোনো সময় ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ইন্স্যুরেন্স থাকলে আপনি বড় ধরণের মেরামত খরচ থেকে বেঁচে যাবেন। আপনি যখন বাংলাদেশে গাড়ি কেনার নিয়ম ২০২৬ এর অধীনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করছেন, তখন এই সব খরচের ফাইল আগে থেকেই তৈরি করে রাখুন। এতে আপনার শখের গাড়িটি রাস্তায় নামাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি হবে না।
৮. রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেইনেন্স খরচের গুরুত্ব না দেওয়া
গাড়ি কিনলেই সব শেষ—এমনটা কিন্তু না। গাড়ি আসলে একটা যন্ত্র, যেটাকে নিয়মিত যত্ন না নিলে সমস্যা শুরু হয়। নতুন যারা গাড়ি কেনেন, তারা অনেক সময় গাড়ির মেইনটেইনেন্স খরচটা আগে থেকে হিসাব করেন না। প্রতি ৩–৪ মাস পরপর ইঞ্জিন অয়েল বদলানো, ফিল্টার পরিষ্কার বা বদলানো, আর ছোটখাটো চেকআপের জন্য কিছু টাকা খরচ হবেই। আপনি যদি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি নেন, তাহলে শুরুতে খরচ একটু কম হতে পারে। কিন্তু পুরোনো বা বেশি ব্যবহৃত গাড়ির ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই বড় খরচ চলে আসতে পারে, যেটা আগে ভাবেননি। আমি সবসময় বলি—গাড়ি কতদিন ভালো থাকবে, সেটা পুরোপুরি মালিকের যত্নের ওপর নির্ভর করে। সময়মতো অয়েল না বদলানো বা সস্তা পার্টস ব্যবহার করলে ইঞ্জিনে বড় সমস্যা হতে পারে। আমাদের দেশের ধুলোবালির জন্য এয়ার ফিল্টার খুব দ্রুত নোংরা হয়ে যায়, এটাও নিয়মিত দেখা দরকার। তাই সহজ করে বললে—গাড়ির যত্নের জন্য মাসে অন্তত ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা আলাদা করে রাখার অভ্যাস করুন। এতে আপনার গাড়ি যেমন ভালো থাকবে, তেমনি ভবিষ্যতে বিক্রি করতে গেলে ভালো দামও পাবেন।
৯. ২০২৬ সালে বাংলাদেশে গাড়ি কেনার নতুন নিয়ম
সময়ের সাথে সাথে সরকার গাড়ি আমদানিতে এবং রেজিস্ট্রেশনে অনেক পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশে গাড়ি কেনার নিয়ম ২০২৬ অনুযায়ী এখন ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (EV) এবং হাইব্রিড গাড়ির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিআরটিএ এখন দালালমুক্ত করার জন্য ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু করেছে। এখন গাড়ি কিনতে হলে ক্রেতার টিন (TIN) সার্টিফিকেট এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র থাকা বাধ্যতামূলক। রিটার্ন না থাকলে আপনি আপনার নামে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন না।
আমি লক্ষ্য করেছি অনেক নতুন ক্রেতা এই নিয়মগুলো জানেন না এবং শেষ মুহূর্তে বিপদে পড়েন। এখন মালিকানা বদলির ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে জালিয়াতি কমানো যায়। আপনি যদি শোরুম থেকে গাড়ি কেনেন, তবে নিশ্চিত হোন যে তারা আপনাকে সব পেপারস জেনুইন দিচ্ছে কিনা। বিআরটিএ পেপারস ভেরিফিকেশন (BRTA papers check) এখন অনেক বেশি কড়াকড়ি করা হয়েছে। নিয়মগুলো সঠিকভাবে মেনে চললে আপনি যেমন আইনি ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকবেন, তেমনি আপনার গাড়ির মালিকানাও সুরক্ষিত থাকবে।
১০. লুক দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং টেস্ট ড্রাইভ না দেওয়া
সবচেয়ে সাধারণ এবং মারাত্মক ভুল হলো শুধুমাত্র গাড়ির বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে প্রেমে পড়ে যাওয়া। আমি অনেককে চিনি যারা শুধুমাত্র সাদা রঙের প্রিমিও পছন্দ বলে এর যান্ত্রিক সমস্যাগুলো উপেক্ষা করেছেন। গাড়িটি দেখতে সুন্দর হলেই যে এর পারফরম্যান্স ভালো হবে তা নয়। পুরাতন গাড়ি কেনার সময় সতর্কতা (Buying used car precautions) হিসেবে কমপক্ষে ১০-১৫ মিনিট টেস্ট ড্রাইভ দেওয়া উচিত। টেস্ট ড্রাইভের সময় খেয়াল করুন স্টিয়ারিং কাঁপে কিনা বা ব্রেক করার সময় কোনো শব্দ হয় কিনা।
গাড়ির বাইরের লুক চাইলে পলিশ পরে ঠিক করা যায়, কিন্তু ইঞ্জিনের অবস্থা ঠিক করা খুবই ব্যয়বহুল। তাই গাড়ি দেখার সময় শুধু চকচকে বডি দেখে খুশি হলে চলবে না, ভেতরের বডির কন্ডিশনের দিকেও ভালো করে নজর দিতে হবে।গাড়িতে বসে আপনার বসার পর আরাম কেমন লাগছে, সামনে–পিছনের ভিউ ঠিক আছে কিনা, আর চালানোর সময় গাড়ি স্মুথ লাগছে কিনা—এসব বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো আপনার দৈনন্দিন ড্রাইভে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা সেটা জানা যেমন দরকার, তেমনি নিজের হাতে গাড়ি চালিয়ে দেখাও জরুরি। চালানোর সময় যদি আপনি স্বস্তি না পান বা মনে হয় গাড়িটা আপনার সাথে যাচ্ছে না, তাহলে বুঝবেন—এই গাড়ি আপনার জন্য না। তাই তাড়াহুড়া না করে ধৈর্য ধরে ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। সঠিক যাচাই বাছাই আর একটু সময় নিলেই আপনি নিজের জন্য একটা সত্যিকারের ভালো গাড়ি বেছে নিতে পারবেন।
- গাড়ির মূল দামের বাইরে ১৫% বাজেট অতিরিক্ত রাখুন।
- বিআরটিএ থেকে পেপারস ভেরিফিকেশন না করে টাকা দেবেন না।
- রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অকশন শিট অরিজিনাল কিনা যাচাই করুন।
- একজন দক্ষ মেকানিক দিয়ে গাড়ির যান্ত্রিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
- রিসেল ভ্যালু ভালো পেতে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের গাড়ি প্রাধান্য দিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. বিআরটিএ পেপারস চেক করার সবচেয়ে সহজ উপায় কী?
বিআরটিএ পেপারস চেক করার সবচেয়ে সহজ এবং নির্ভরযোগ্য উপায় হলো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে বিআরটিএ-র অনলাইন পোর্টালে (BSP) চেক করা। তবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপনাকে সশরীরে অফিস এ গিয়ে কাজ করে দেখে শুনে রেকর্ড রুমের তথ্যের সাথে গাড়ির স্মার্ট কার্ড, চ্যাসিস এবং ইঞ্জিন নম্বর মিলিয়ে দেখতে হবে। কোনো ধরণের ব্যাংক লোন বা বকেয়া জরিমানা আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে বিআরটিএ-র ডাটাবেজ যাচাই করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া বর্তমান সময়ে ডিজিটাল রিসিট বা বারকোড স্ক্যান করেও প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করা সম্ভব যা আপনাকে প্রতারণা থেকে রক্ষা করবে।
২. গাড়ি কেনার সময় হিডেন কস্টগুলো কী কী হতে পারে?
গাড়ি কেনার হিডেন কস্টের মধ্যে প্রধান হলো নাম ট্রান্সফার ফি, যা গাড়ির সিসি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এছাড়া আছে বিআরটিএ-র বকেয়া ট্যাক্স বা ফাইন, যা অনেক সময় আগের মালিক পরিশোধ করেন না। এরপর আসে রেজিস্ট্রেশন ফি, অগ্রিম আয়কর (AIT), এবং প্রথমবার গাড়িটির পূর্ণাঙ্গ সার্ভিসিং খরচ। ব্যবহৃত গাড়ির ক্ষেত্রে টায়ার পরিবর্তন, ব্যাটারি চেক এবং ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে গিয়ে বাজেটের বাইরে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। আমি পরামর্শ দিই গাড়ি কেনার আগে একটি বিস্তারিত বাজেট শিট তৈরি করতে যাতে রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে এয়ার ফ্রেশনার কেনা পর্যন্ত সব খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
৩. প্রথম গাড়ির জন্য রিকন্ডিশন্ড না কি ব্যবহৃত গাড়ি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ?
এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনার বাজেট এবং গাড়ির টেকনিক্যাল নলেজের ওপর। আপনার যদি বাজেট ২০ লক্ষ টাকার বেশি হয় এবং আপনি ঝামেলামুক্ত ড্রাইভ চান, তবে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি সেরা সিদ্ধান্ত। রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে জাপান থেকে পাওয়া অকশন শিট থাকে যা গাড়ির প্রকৃত অবস্থার গ্যারান্টি দেয়। অন্যদিকে, আপনার বাজেট যদি সীমিত হয় (যেমন ৮-১২ লক্ষ টাকা), তবে আপনাকে ব্যবহৃত বা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি নিতে হবে। তবে ব্যবহৃত গাড়ি কেনার সময় ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই যান্ত্রিক পরীক্ষা এবং পেপারস যাচাইয়ে কোনো আপস করা যাবে না। প্রথম গাড়ির ক্ষেত্রে সাধারণত জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনাই সবচেয়ে নিরাপদ।
৪. এলপিজি কনভারশন কি ইঞ্জিনের ক্ষতি করে?
অকটেন বনাম এলপিজি খরচ তুলনা করলে এলপিজি অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তবে সঠিকভাবে এবং ভালো মানের কিট দিয়ে কনভার্ট না করলে এটি দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিনের ক্ষতি করতে পারে। এলপিজিতে অকটেনের তুলনায় কম লুব্রিকেশন হয়, যার ফলে ইঞ্জিনের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যায়। তবে আধুনিক 'সিকুয়েন্সিয়াল কিট' ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব বজায় থাকে। যারা প্রতিদিন ঢাকার জ্যামে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান, তাদের জন্য এলপিজি একটি লাভজনক অপশন। কিন্তু মনে রাখবেন, নিয়মিত টিউনিং এবং জেনুইন পার্টস ব্যবহার করলে এলপিজিতেও ইঞ্জিন ভালো থাকে। হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে এলপিজি না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৫. ২০২৬ সালে গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে নতুন কর নিয়ম কী?
২০২৬ সালের নতুন নিয়মানুযায়ী, গাড়ি আমদানিতে সিসি অনুযায়ী শুল্ক কাঠামো কিছুটা পুনর্গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন কমাতে পুরনো গাড়ির ওপর চার্জ বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন বা সময় আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়া মাল্টিপল বা একাধিক গাড়ি থাকলে আপনার 'কার সারচার্জ' বা অতিরিক্ত কর দিতে হবে। হাইব্রিড এবং ইলেকট্রিক গাড়ির (EV) জন্য সরকার ট্যাক্স বেনিফিট দিচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব গাড়ি কিনলে আপনাকে আর্থিক সুবিধা দিবে। বাংলাদেশের গাড়ি কেনার নিয়ম এখন ডিজিটাল ডেটাবেজের সাথে যুক্ত, তাই ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
উপসংহার
প্রথম গাড়ি কেনা আপনার জীবনের অন্যতম সেরা একটি মুহূর্ত হওয়া উচিত, কোনো দুঃস্বপ্ন নয়। বাংলাদেশে প্রথম গাড়ি কেনার আগে যেসব ভুল সবাই করে তা যদি আপনি এড়িয়ে চলতে পারেন, তবে আপনার এই যাত্রা হবে অত্যন্ত সুখকর। বাজেটিং, যান্ত্রিক পরীক্ষা এবং গাড়ির পেপারস চেক করার সঠিক উপায়—এই তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। শখের বশে তাড়াহুড়ো না করে অন্তত ১০-১৫ দিন সময় নিয়ে যাচাই-বাছাই করুন। আপনার কষ্টার্জিত টাকা সঠিক গাড়িতে বিনিয়োগ করুন। গাড়ি কেনা-বেচা সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য সবসময় CarSell.com.bd এর সাথে থাকুন। আপনার প্রথম গাড়ির যাত্রা আনন্দদায়ক ও নিরাপদ হোক!