Toyota Noah vs Voxy – বাংলাদেশের জন্য সেরা পারিবারিক MPV কোনটি?

 প্রকাশ: ০৫ অগাস্ট ২০২৫, ০৯:০৮ অপরাহ্ন   |   গাড়ি , নিউজ ও রিভিউ

Toyota Noah vs Voxy – বাংলাদেশের জন্য সেরা পারিবারিক MPV কোনটি?

Toyota Noah vs Voxy – বাংলাদেশের জন্য সেরা পারিবারিক MPV কোনটি?

আমি যখনই ঢাকার রাস্তায় বের হই, তখনই তখন বড় বড়  কিছু রাজকীয় গাড়ি রাস্তায় দেখতে পাই । এই বড় গাড়িগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় নাম হলো টয়োটা নোয়াহ এবং টয়োটা ভক্সি। বাংলাদেশের মাঝারি থেকে বড় পরিবারগুলোর কাছে এই দুটি গাড়ি স্বপ্নের মতো। তবে যখন কেউ কিনতে যায়, তখন সবচেয়ে বড় দ্বিধা তৈরি হয়— Toyota Noah vs Voxy এর মধ্যে কোনটি সেরা? আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দুটি গাড়িই ব্যবহার করেছি এবং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি কেন মানুষ এই গাড়িগুলোর পেছনে পাগল।

১. নোয়াহ এবং ভক্সি: কেন এরা পারিবারিক MPV বাংলাদেশ এর রাজা?

আমি সবসময় বলি, বাংলাদেশের রাস্তায় যদি আপনি আরামদায়ক এবং বড় পরিসরের গাড়ি খুঁজেন, তবে পারিবারিক MPV বাংলাদেশ মার্কেটে টয়োটার এই দুটি মডেলের কোনো বিকল্প নেই। নোয়াহ এবং ভক্সি মূলত একই চ্যাসিস এবং ইঞ্জিনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তবে এদের চারিত্রিক কিছু পার্থক্য আছে যা ব্যবহারকারীকে আলাদা স্বাদ দেয়। আমি দেখেছি, যারা একটু শান্ত এবং সাধারণ লুক পছন্দ করেন তারা নোয়াহ বেছে নেন, আর যারা একটু আধুনিক ও স্পোর্টি লুক চান তারা ভক্সির দিকে ঝুঁকেন।

টয়োটার এই গাড়িগুলো জনপ্রিয় হওয়ার প্রধান কারণ হলো এদের ৮ জনের বসার ক্ষমতা এবং বিশাল মালামাল রাখার জায়গা। আপনি যদি পরিবার নিয়ে সিলেট বা কক্সবাজার যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে এই গাড়িগুলো আপনাকে যে পরিমাণ রিলাক্স দেবে তা কোনো সাধারণ সেডান গাড়িতে সম্ভব নয়। আমার অভিজ্ঞতায়, এই গাড়িগুলোর স্লাইডিং ডোর বা স্বয়ংক্রিয় দরজা ছোট বাচ্চা এবং বয়স্কদের ওঠা-নামার জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক। এই সব কারণেই টয়োটার এই ডাবলু বা টুইন মডেলগুলো আমাদের দেশে এতোটা প্রভাব বিস্তার করেছে।

টয়োটা নোয়াহ এবং ভক্সি মূলত টয়োটা 'এস্কুয়ায়ার' (Esquire) এর সাথে একই প্ল্যাটফর্মে তৈরি, যার ফলে এদের ইঞ্জিন এবং ইন্টারনাল পার্টস প্রায় ১০০% একই।

২. ডিজাইন এবং এক্সটেরিয়র: কে বেশি স্টাইলিশ?

আপনি যখন প্রথমবার এই দুটি গাড়ি একসাথে দেখবেন, আপনার মনে হবে একটি বড় ভাইয়ের মতো গম্ভীর আর অন্যটি আধুনিক তরুণের মতো চটপটে। Toyota Noah vs Toyota Voxy বাংলাদেশ এর প্রেক্ষাপটে আমি যদি ডিজাইনের কথা বলি, তবে ভক্সি নির্দ্বিধায় এগিয়ে থাকবে। ভক্সির সামনের ডাবল হেডলাইট এবং বিশাল গ্রিল এটিকে একটি অ্যাগ্রেসিভ লুক দেয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভক্সির 'ZS' ভ্যারিয়েন্টটি খুব পছন্দ করি কারণ এর বডি কিটগুলো গাড়িটিকে আরও নিচু এবং প্রিমিয়াম দেখায়।

অন্যদিকে, টয়োটা নোয়াহ এর ডিজাইন অনেক বেশি পরিমার্জিত এবং ক্ল্যাসিক। এর বড় সিঙ্গেল হেডলাইট এবং সরল রেখার ডিজাইন অনেক দিন পুরনো হলেও দেখতে খারাপ লাগে না। যারা মনে করেন গাড়ি খুব বেশি জাঁকজমক করার দরকার নেই, তাদের জন্য নোয়াহ সেরা। আমি লক্ষ্য করেছি, কর্পোরেট অফিস বা সরকারি প্রটোকলে নোয়াহ বেশি ব্যবহৃত হয়, যেখানে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মানুষ ভক্সিকে বেশি প্রাধান্য দেয়। সুতরাং, ডিজাইন আপনার রুচির ওপর নির্ভর করবে—আপনি কি স্পোর্টি হতে চান না কি ক্ল্যাসিক?

ট্রিম এবং বডি কিটের পার্থক্য

নোয়াহ এর SI ভ্যারিয়েন্ট এবং ভক্সির ZS ভ্যারিয়েন্ট মূলত স্পোর্টি লুক অফার করে। আমি যখন এই দুটি মডেল টেস্ট ড্রাইভ করি, তখন মনে হয়েছে বডি কিট থাকার কারণে ভক্সি রাস্তার বাতাসের সাথে একটু বেশি স্থির থাকে। তবে নোয়াহ এর সাধারণ বডি ঢাকার গর্তযুক্ত রাস্তায় কিছুটা বেশি সুবিধা দেয়।

৩. ইন্টেরিয়র এবং কেবিন স্পেস: কমফোর্ট কার বেশি?

ভিতরে ঢুকলে আপনি টয়োটার আসল কারিশমা দেখতে পাবেন। আমি যখন ভক্সির কেবিনে বসি, তখন এর ব্ল্যাক ইন্টেরিয়র আমাকে একটি প্রিমিয়াম অনুভূতি দেয়। তবে আপনি যদি নোয়াহ এর দিকে তাকান, অনেক মডেলে বেইজ বা হালকা রঙের ইন্টেরিয়র পাওয়া যায়, যা গাড়িটিকে ভেতর থেকে অনেক বেশি খোলামেলা বা প্রশস্ত মনে করতে সাহায্য করে। Toyota Noah নাকি Voxy কিনবেন তা ঠিক করার আগে আপনাকে অবশ্যই পেছনের সিটে বসে দেখা উচিত। এদের লেগ স্পেস এবং হেড রুম যেকোনো লাক্সারি গাড়ির চেয়েও বেশি।

এই গাড়িগুলোর অন্যতম সেরা ফিচার হলো এদের ক্যাপ্টেন সিট। আপনি যদি ৭-সিটার ভ্যারিয়েন্ট কেনেন, তবে মাঝের দুই যাত্রী বিমানের বিজনেস ক্লাসের মতো আরাম পাবেন। আমি পরিবার নিয়ে লং ট্যুরে গেলে সবসময় মাঝের সিটগুলো দখলের জন্য মারামারি দেখি। নোয়াহ এবং ভক্সি উভয় গাড়িতেই পর্যাপ্ত এসি ভেন্ট রয়েছে, যা ঢাকার কড়া রোদেও পেছনের যাত্রীদের দ্রুত ঠান্ডা করতে পারে। ক্যাবিনের নীরবতা বা নয়েজ ইনসুলেশনও বেশ প্রশংসনীয়, যা ভ্রমণকে আরও সুখকর করে তোলে।

সতর্কতা: বাংলাদেশের সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে অনেক সময় ৭-সিটার গাড়িকে ৮-সিটার হিসেবে চালানো হয়। কেনার আগে অবশ্যই ব্লু-বুকের সাথে সিট সংখ্যা মিলিয়ে নিন।

৪. ইঞ্জিন এবং পারফরম্যান্স: হাইব্রিড না কি নন-হাইব্রিড?

ইঞ্জিনের দিক থেকে Toyota Noah vs Voxy এ কোনো বড় পার্থক্য নেই। উভয় গাড়িতেই সাধারণত ২.০ লিটার (২০০০ সিসি) পেট্রোল ইঞ্জিন অথবা ১.৮ লিটার (১৮০০ সিসি) হাইব্রিড ইঞ্জিন থাকে। আমি যখন হাইব্রিড ভার্সনটি চালিয়েছি, তখন এর স্মুথনেস এবং জ্বালানি সাশ্রয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। হাইব্রিড ব্যাটারি এবং মোটরের সমন্বয়ে গাড়িটি যখন নিস্তব্ধভাবে স্টার্ট হয়, তখন মনেই হয় না যে ইঞ্জিন চলছে। হাইব্রিড ভ্যারিয়েন্ট ঢাকার ট্রাফিক জ্যামের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী।

তবে আপনি যদি পাওয়ার এবং টর্ক বেশি চান, তবে ২.০ লিটার পেট্রোল ভার্সনটি সেরা। এটি হাইওয়েতে ওভারটেক করার সময় আপনাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস দেবে। আমি অনেক ব্যবহারকারীর সাথে কথা বলেছি যারা মনে করেন হাইব্রিড মেইনটেইন করা বাংলাদেশে কঠিন, তবে বর্তমানে আমাদের মেকানিকরা অনেক দক্ষ হয়েছে। হাইব্রিড নিলে আপনি ফুয়েল কস্ট প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমাতে পারবেন। তবে পেট্রোল ভার্সনটি অনেক বেশি রাফ-এন্ড-টাফ ব্যবহারের জন্য উপযোগী। আমি ব্যক্তিগতভাবে হাইব্রিডকেই প্রাধান্য দিই যদি আপনি নিয়মিত শহরে ড্রাইভ করেন।

ইঞ্জিন স্পেসিফিকেশন টেবিল

বৈশিষ্ট্য পেট্রোল ভার্সন (২.০ লিটার) হাইব্রিড ভার্সন (১.৮ লিটার)
পাওয়ার (Horsepower) ১৫০-১৫৫ hp ৯৮-১২০ hp (Combined)
ট্রান্সমিশন CVT e-CVT
জ্বালানি ব্যবস্থা অকটেন অকটেন + ইলেকট্রিক মোটর
শহরের মাইলেজ ৭-৯ কিমি/লিটার ১৬-১৮ কিমি/লিটার

৫. গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স এবং বাংলাদেশের রাস্তা

বাংলাদেশের রাস্তার কথা চিন্তা করলে গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স একটি বড় চিন্তার বিষয়। আমি যখন আমার বন্ধুদের নোয়াহ বা ভক্সি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যেতে দেখি, তখন তারা প্রায়ই স্পিড ব্রেকারে তলার দিকটা ঘষা লাগার ভয়ে থাকেন। নোয়াহ এবং ভক্সির গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স সাধারণত ১৬০ মিমি থেকে ১৬৫ মিমি এর আশেপাশে থাকে। লোডেড অবস্থায় (৮ জন মানুষ সহ) গাড়িটি আরও নিচে নেমে যায়। এটি একটি বড় সমস্যা হতে পারে যদি আপনার এলাকায় উঁচু স্পিড ব্রেকার থাকে।

তবে আমি একটি টিপস শেয়ার করি—অনেকে বাংলাদেশে গাড়ির স্প্রিং এর সাথে প্যাড বা স্পেসার ব্যবহার করেন গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স কিছুটা বাড়াতে। যদিও এটি কোম্পানির রিকমেন্ডেশন নয়, তবুও ঢাকার রাস্তার জন্য এটি বেশ জনপ্রিয় সমাধান। নোয়াহ এর স্ট্যান্ডার্ড ভ্যারিয়েন্টগুলো ভক্সির জেডএস (ZS) বা নোয়াহ এসআই (SI) এর চেয়ে কিছুটা বেশি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স অফার করে কারণ এগুলোতে কোনো বাড়তি বডি কিট থাকে না। তাই আপনি যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বেশি যাতায়াত করেন, তবে নোয়াহ এর বেসিক মডেল নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

৬. সেফটি ফিচারস: পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে কে?

পরিবারের কথা যখন আসে, তখন নিরাপত্তা সবার আগে। Noah vs Voxy কোনটা ভালো সেফটির দিক থেকে? আমি দেখেছি টয়োটা উভয় মডেলেই তাদের 'Toyota Safety Sense' (TSS) টেকনোলজি ব্যবহার করেছে। এতে প্রি-কলিশন সিস্টেম, লেন ডিপারচার এলার্ট এবং অটোমেটিক হাই বিমের মতো আধুনিক সব সুবিধা রয়েছে। আমি যখন জ্যামে বা হাইওয়েতে চালাই, তখন এই সিস্টেমগুলো ড্রাইভারকে সতর্ক রাখে এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা থেকে বাঁচায়।

উভয় গাড়িতেই ৬টি থেকে ৮টি এয়ারব্যাগ থাকে (মডেল ভেদে)। এছাড়া এবিএস (ABS), ইবিডি (EBD) এবং ট্র্যাকশন কন্ট্রোল তো আছেই। ভক্সির স্পোর্টি ট্রিমগুলোতে অনেক সময় ব্রেকিং সিস্টেম একটু বেশি রেসপন্সিভ মনে হয়। আমি সবসময় বলি, একটি MPV গাড়ি কেনার সময় এর এয়ারব্যাগ এবং ব্রেকিং কন্ডিশন ভালো করে চেক করে নেওয়া উচিত। টয়োটা এই সেগমেন্টে জাপানিজ সেফটি স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখেছে, তাই নিরাপত্তার দিক থেকে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

২০১৪ এর পরবর্তী মডেলগুলোতে টয়োটা তাদের সেফটি প্যাকেজ আরও উন্নত করেছে, যা এখন বাংলাদেশের রিকন্ডিশন্ড মার্কেটে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।

৭. বাংলাদেশে বর্তমান বাজারদর: টয়োটা নোয়াহ বনাম ভক্সি

দামের কথা আসলে পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হয়ে যায়। বাংলাদেশে Toyota Noah vs Voxy এর দাম মূলত এদের রেজিস্ট্রেশন বছর, অকশন গ্রেড এবং ভ্যারিয়েন্টের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত ভক্সি এর স্টাইলিশ লুকের কারণে নোয়াহ এর চেয়ে ১ থেকে ২ লক্ষ টাকা বেশি দামি হয়। আমি যখন বাজার যাচাই করলাম, দেখলাম যে ২০১৮-২০১৯ মডেলের একটি ভালো রিকন্ডিশন্ড নোয়াহ এর দাম ৩৫ থেকে ৩৮ লক্ষ টাকার আশেপাশে। অন্যদিকে একই বছরের একটি ভক্সি কিনতে আপনাকে ৩৮ থেকে ৪২ লক্ষ টাকা খরচ করতে হতে পারে।

সেকেন্ড হ্যান্ড বা ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে আপনি ২৫ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার মধ্যেও নোয়াহ বা ভক্সি পেতে পারেন (২০১৪-২০১৫ মডেল)। তবে আমি পরামর্শ দেব, বাজেটে কিছুটা ছাড় দিলেও ভালো কন্ডিশনের গাড়ি কেনার জন্য। কারণ এই গাড়িগুলোর রিপেয়ারিং খরচ অনেক সময় বেশি হয়ে যেতে পারে যদি আগের মালিক যত্ন না নেন। দামের এই সামান্য পার্থক্য আপনাকে দীর্ঘমেয়াদে হয়তো ভালো স্টাইল (ভক্সি) অথবা অধিক সঞ্চয় (নোয়াহ) এর মধ্যে বেছে নিতে সাহায্য করবে।

এক নজরে আনুমানিক দাম (২০২৪ আপডেট)

১. রিকন্ডিশন্ড নোয়াহ (২০১৮-১৯): ৩৫-৩৯ লক্ষ টাকা।
২. রিকন্ডিশন্ড ভক্সি (২০১৮-১৯): ৩৭-৪২ লক্ষ টাকা।
৩. হাইব্রিড ভ্যারিয়েন্ট: পেট্রোল ভার্সনের চেয়ে ২-৩ লক্ষ টাকা বেশি হতে পারে।
৪. ব্যবহৃত পুরোনো মডেল (২০১৪-১৬): ২২-২৯ লক্ষ টাকা।

৮. ফুয়েল ইকোনমি: Noah vs Voxy কোনটা ভালো?

জ্বালানি খরচ আমাদের দেশের জন্য একটি অনেক বড় ফ্যাক্টর। Noah vs Voxy কোনটা ভালো মাইলেজের দিক থেকে? যেহেতু দুই গাড়ির ইঞ্জিন একদম একই, তাই মাইলেজে কোনো বড় তফাৎ নেই। পেট্রোল ২.০ লিটার ইঞ্জিনে আপনি শহরে ৬-৮ কিমি/লিটার এবং হাইওয়েতে ১০-১২ কিমি/লিটার মাইলেজ পাবেন। এটি একটি বড় গাড়ির জন্য বেশ স্বাভাবিক। আমি যখন আমার বন্ধুদের সাথে লং ট্যুরে যাই, তখন আমরা সবসময় ফুয়েল কস্ট শেয়ার করি এবং দেখি এটি বেশ ব্যয়বহুল যদি পেট্রোলে চালানো হয়।

তবে আপনি যদি হাইব্রিড বেছে নেন, তবে চিত্রটি বদলে যাবে। আমি নিজে হাইব্রিড ভক্সি চালিয়ে শহরে ১৫-১৭ কিমি/লিটার মাইলেজ পেয়েছি। এটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে কিন্তু জ্যামে যখন গাড়িটি ইলেকট্রিক মোডে চলে, তখন এক ফোঁটা তেলও খরচ হয় না। আপনি যদি প্রতিদিন যাতায়াতের জন্য এটি ব্যবহার করতে চান, তবে হাইব্রিড ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করা ভুল হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রতিযোগিতায় হাইব্রিড নোয়াহ এবং ভক্সি উভয়ই সমানভাবে জয়ী।

৯. মেইনটেইনেন্স এবং পার্টস সহজলভ্যতা

টয়োটা কেনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর পার্টস বাংলাদেশের যেকোনো মোড়ের দোকানে পাওয়া যায়। আমি অনেককে দেখেছি যারা ইউরোপীয় গাড়ি কিনে পার্টস না পেয়ে মাসখানেক গ্যারেজে গাড়ি ফেলে রাখেন। কিন্তু নোয়াহ বা ভক্সির ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। ধোলাইখাল থেকে শুরু করে বাংলামোটর—পার্টস পাওয়া নিয়ে আপনাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। ইঞ্জিন অয়েল, এয়ার ফিল্টার বা ব্রেক প্যাড যেকোনো সাধারণ সার্ভিস সেন্টারে অনায়াসেই পরিবর্তন করা যায়।

তবে হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে আপনাকে কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে। আমি সবসময় পরামর্শ দিই হাইব্রিড গাড়ির ব্যাটারি এবং কুলিং সিস্টেম দক্ষ মেকানিক দিয়ে চেক করানোর জন্য। নোয়াহ এবং ভক্সির সাসপেনশন পার্টস ঢাকার রাস্তার কারণে দ্রুত ক্ষয় হতে পারে, তাই নিয়মিত বুশ এবং মাউন্টিং চেক করা জরুরি। সামগ্রিকভাবে, এই গাড়িগুলোর মেইনটেইনেন্স খরচ মাঝারি পর্যায়ের। আপনি যদি নিয়মমতো সার্ভিসিং করেন, তবে এই গাড়িগুলো অনায়াসেই ৫-১০ বছর কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই চলবে।

টয়োটা নোয়াহ এবং ভক্সির বডি পার্টস (যেমন হেডলাইট, বাম্পার) ভক্সির ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যয়বহুল হতে পারে কারণ এর ডিজাইন জটিল।

১০. রিসেল ভ্যালু: কয়েক বছর পর দামে কে জয়ী?

আমরা বাঙালিরা গাড়ি কেনার আগেই চিন্তা করি বিক্রির সময় কত দাম পাব। এক্ষেত্রে Toyota Noah vs Toyota Voxy বাংলাদেশ এর মার্কেটে উভয়েই অজেয়। টয়োটা নোয়াহ এর রিসেল ভ্যালু ঐতিহাসিকভাবেই খুব ভালো। কারণ এটি অনেক দিন ধরে আমাদের দেশে জনপ্রিয়। তবে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ঝোঁক ভক্সির দিকে বেশি হওয়ায়, সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির মার্কেটে ভক্সির চাহিদাও এখন তুঙ্গে। আমি দেখেছি একটি ফ্রেশ কন্ডিশনের ভক্সি বাজারে আসার সাথে সাথেই বিক্রি হয়ে যায়।

আপনি যদি ২-৩ বছর চালিয়ে গাড়িটি বিক্রি করতে চান, তবে আপনি আপনার কেনা দামের কাছাকাছি দামই ফেরত পাওয়ার আশা রাখতে পারেন (যদি কন্ডিশন ভালো থাকে)। ভক্সির স্টাইলিশ লুক এটিকে একটি হট কেক বানিয়ে রেখেছে। তবে নোয়াহ এর সাধারণ লুকের কারণে এর কাস্টমার বেস অনেক বড়। আমি মনে করি রিসেল ভ্যালুর দিক থেকে উভয় গাড়িই আপনাকে হতাশ করবে না। তবে সাদা এবং মুক্তা (Pearl) রঙের রিসেল ভ্যালু অন্যান্য রঙের চেয়ে বাংলাদেশে সবসময় কিছুটা বেশি থাকে।

১১. চূড়ান্ত রায়: আপনার জন্য কোনটি সেরা?

পুরো আলোচনার পর আমরা এখন শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি। Toyota Noah নাকি Voxy? আমি যদি সহজ করে বলি—আপনি যদি একজন গম্ভীর মানুষ হন এবং গাড়িটিকে মূলত পরিবারের যাতায়াত বা অফিসের কাজে ব্যবহার করতে চান, তবে টয়োটা নোয়াহ আপনার জন্য পারফেক্ট। এটি সাশ্রয়ী, মার্জিত এবং এর রিসেল ভ্যালু দারুণ। এটি মূলত সেই সব মানুষের জন্য যারা হুজুগে না মেতে নির্ভরযোগ্যতাকে প্রাধান্য দেন।

অন্যদিকে, আপনি যদি একটু স্টাইলিশ হতে চান, আপনার গাড়িতে আধুনিকতার ছোঁয়া পছন্দ করেন এবং রাস্তায় আলাদাভাবে নজরে পড়তে চান, তবে চোখ বন্ধ করে টয়োটা ভক্সি নিন। ভক্সি কেবল একটি গাড়ি নয়, এটি একটি স্টাইল স্টেটমেন্ট। যদিও দাম কিছুটা বেশি, কিন্তু এটি যে প্রিমিয়াম ফিল দেবে তা অসাধারণ। আপনার বাজেট যদি পারমিট করে, তবে ভক্সি ZS হাইব্রিড হবে আমার ব্যক্তিগত সেরা রিকমেন্ডেশন। পরিবার বড় হলে এবং যাতায়াতে বিলাসিতা চাইলে এই দুটির যেকোনো একটিই আপনার জীবনকে অনেক সহজ করে দেবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. টয়োটা নোয়াহ এবং ভক্সির মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

টয়োটা নোয়াহ এবং ভক্সির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো তাদের বাহ্যিক নকশা বা ডিজাইন। নোয়াহ এর লুক অনেক বেশি ক্ল্যাসিক এবং সাধারণ, যা মূলত কর্পোরেট বা ফ্যামিলি ব্যবহারের জন্য তৈরি। অন্যদিকে, ভক্সি অনেক বেশি স্পোর্টি এবং অ্যাগ্রেসিভ ডিজাইনের, যার হেডলাইট এবং গ্রিল আলাদাভাবে চোখে পড়ে। এদের ইঞ্জিন, চ্যাসিস এবং ইন্টেরিয়র স্পেস প্রায় ১০০% একই। ভক্সিকে সাধারণত নোয়াহ এর প্রিমিয়াম এবং স্টাইলিশ ভার্সন হিসেবে ধরা হয়।

২. হাইব্রিড নোয়াহ/ভক্সি কেনা কি বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি?

বর্তমানে বাংলাদেশে হাইব্রিড নোয়াহ বা ভক্সি কেনা মোটেও ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কয়েক বছর আগে হাইব্রিড মেকানিক বা পার্টস পাওয়া কঠিন ছিল, কিন্তু এখন ঢাকার প্রায় প্রতিটি বড় গ্যারেজেই হাইব্রিড সার্ভিস পাওয়া যায়। হাইব্রিড ব্যাটারির স্থায়িত্ব সাধারণত ৮-১০ বছর পর্যন্ত হয় এবং এটি পরিবর্তন করাও এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। হাইব্রিড নিলে আপনি ফুয়েল কস্টে বিশাল সাশ্রয় পাবেন, যা বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানির দামের প্রেক্ষাপটে অনেক লাভজনক।

৩. ৮ জন মানুষ নিয়ে লং ট্যুরে কি এই গাড়িগুলো আরামদায়ক?

হ্যাঁ, টয়োটা নোয়াহ এবং ভক্সি ৮ জন মানুষের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক। তবে আপনি যদি সর্বোচ্চ কমফোর্ট চান, তবে ৭-সিটার ভ্যারিয়েন্টটি নেওয়া ভালো কারণ মাঝখানের ক্যাপ্টেন সিটগুলো অনেক বেশি প্রশস্ত এবং রিলাক্সিং। ৮ জন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ বসলে সামান্য জায়গা কম মনে হতে পারে, কিন্তু সাধারণ সেডান বা ৫-সিটার এসইউভি থেকে এটি অনেক গুণ বেশি আরামদায়ক। বিশেষ করে পেছনের এসি ভেন্ট এবং পর্যাপ্ত লেগ স্পেস ভ্রমণকে আনন্দদায়ক করে তোলে।

৪. গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স কম হওয়ার সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়?

নোয়াহ এবং ভক্সির গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স ১৬০-১৬৫ মিমি, যা বাংলাদেশের অনেক উঁচু স্পিড ব্রেকারে ঘষা লাগতে পারে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশে অনেকেই স্প্রিং এর সাথে 'রাবার স্পেসার' বা প্যাড ব্যবহার করেন যা গাড়িকে ১-২ ইঞ্চি উঁচু করে দেয়। এছাড়া চাকার টায়ার প্রোফাইল কিছুটা বড় ব্যবহার করেও গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স সামান্য বাড়ানো সম্ভব। তবে বড় চাকা লাগালে মাইলেজে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো স্পিড ব্রেকারে গাড়িটি আড়াআড়িভাবে ধীরে চালানো।

৫. ভক্সি না কি নোয়াহ—রিসেল ভ্যালু কার বেশি?

বাংলাদেশে উভয় গাড়িরই রিসেল ভ্যালু চমৎকার। তবে দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তার কারণে টয়োটা নোয়াহ এর রিসেল মার্কেট কিছুটা বেশি স্থিতিশীল এবং এর কাস্টমার অনেক বেশি। অন্যদিকে, ভক্সির বর্তমান ক্রেজ এবং স্টাইলিশ ডিজাইনের কারণে এটিও বাজারে আসার সাথে সাথে ভালো দামে বিক্রি হয়ে যায়। তবে আপনি যদি ৫-৭ বছর ব্যবহার করে বিক্রির চিন্তা করেন, তবে সাদা রঙের নোয়াহ বা ভক্সি আপনাকে সর্বোচ্চ রিটার্ন দেবে কারণ এই রঙের চাহিদা আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি।

আপনার পরিবারের জন্য সেরা MPV খুঁজছেন?

আজই ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং সেরা দামে আপনার পছন্দের Toyota Noah বা Voxy খুঁজে নিন!

CarSell.com.bd - বিশ্বাসযোগ্য গাড়ি কেনাবেচার ঠিকানা

ডিসক্লেইমার: এই আর্টিকেলে উল্লেখিত দাম এবং তথ্যগুলো বর্তমান বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সময়ের সাথে সাথে দাম এবং স্পেসিফিকেশন পরিবর্তিত হতে পারে।